জমজমের পানি পান করার নিয়ম ও দোয়া
জমজমের পানি পান করার সুন্নতি নিয়ম হলো বিসমিল্লাহ বলে, কিবলামুখী হয়ে, তিন শ্বাসে তৃপ্তিসহ পান করা, পান করার সময় কল্যাণের নিয়ত করা এবং শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলা। জমজমের পানি পান করার সময় একটি প্রসিদ্ধ দোয়া পড়া মুস্তাহাব।
অনেক মুসল্লি হজ্জ প্যাকেজ -এর মাধ্যমে হজ পালন করতে গিয়ে এসব সুন্নতি আদব অনুসরণ করে জমজমের পানি পান করেন।
হাদিসে এসেছে, "জমজমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হয়, সেই উদ্দেশ্যের জন্যই তা উপকারী হয়।" (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: 3062)
এই হাদিসটির আরবি মূল পাঠ বা উচ্চারণ হলো:
مَاءُ زَمْزَمَ لِمَا شُرِبَ لَهُ
(উচ্চারণ: মা-উ যামযামা লিমা শুরিবা লাহু)
জমজমের পানি কী?
জমজমের পানি হলো মক্কায় অবস্থিত মসজিদুল হারামের ভেতরে কাবা শরিফের নিকটস্থ জমজম কূপ থেকে উৎসারিত পানি। ইসলামী ইতিহাস অনুযায়ী আল্লাহ তাআলা হজরত ইসমাইল (আ.) ও তাঁর মা হাজেরা (আ.)-এর জন্য অলৌকিকভাবে এই পানির ব্যবস্থা করেন।
প্রতি বছর উমরাহ প্যাকেজ নির্বাচন করে মক্কায় যাওয়া লাখো মুসল্লি এই বরকতময় পানি পান করেন এবং পরিবারের সদস্যদের জন্যও সঙ্গে নিয়ে আসেন।
জমজমের পানির বিশেষ বৈশিষ্ট্য
- মক্কার পবিত্র কূপের পানি।
- ইসলামে বরকতময় পানি হিসেবে পরিচিত।
- হজ ও ওমরাহ পালনকারীরা ব্যাপকভাবে পান করেন।
- রাসুল ﷺ জমজমের পানির মর্যাদা বর্ণনা করেছেন।
- মুসলিমরা দোয়া ও কল্যাণের নিয়তে পান করেন।
জমজমের পানি পান করার সুন্নতি নিয়ম
১. বিসমিল্লাহ বলে পান করুন
প্রতিটি হালাল খাদ্য ও পানীয় গ্রহণের আগে "বিসমিল্লাহ" বলা সুন্নাহ। জমজমের পানির ক্ষেত্রেও একই আদব প্রযোজ্য।
২. কিবলামুখী হওয়া
অনেক সাহাবি ও সালাফ জমজমের পানি পান করার সময় কিবলামুখী হতেন। অধিকাংশ আলেম এটিকে মুস্তাহাব হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
৩. বসে পানি পান করা
রাসুলুল্লাহ ﷺ অধিকাংশ সময় বসে পানি পান করতেন। তাই সুযোগ থাকলে বসে জমজমের পানি পান করা উত্তম।
৪. তিন শ্বাসে পান করা
সুন্নাহ অনুযায়ী পানি এক নিঃশ্বাসে না পান করে তিন ধাপে পান করা উত্তম।
ধাপগুলো হলো—
- প্রথমবার পান করুন।
- শ্বাস নিন।
- দ্বিতীয়বার পান করুন।
- আবার শ্বাস নিন।
- তৃতীয়বার পান সম্পন্ন করুন।
৫. তৃপ্তি নিয়ে পান করা
হাদিসে জমজমের পানি পর্যাপ্তভাবে পান করার কথা উল্লেখ রয়েছে। অনেক আলেম বলেন, তৃপ্তিসহ পান করা মুস্তাহাব।
৬. পান করার সময় দোয়া করা
জমজমের পানি পান করার সময় আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন ও কল্যাণের জন্য দোয়া করা উত্তম।
৭. শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলা
পানি পান শেষ হলে আল্লাহর প্রশংসা করা সুন্নাহ।
জমজমের পানি পান করার দোয়া
আরবি
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا، وَرِزْقًا وَاسِعًا، وَشِفَاءً مِنْ كُلِّ دَاءٍ
বাংলা উচ্চারণ
আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা ইলমান নাফিআ, ওয়া রিযকান ওয়াসিআ, ওয়া শিফাআম মিন কুল্লি দা'।
বাংলা অর্থ
হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, প্রশস্ত রিজিক এবং সব ধরনের রোগ থেকে শিফা প্রার্থনা করছি।
এই দোয়াটি ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আমলের ভিত্তিতে প্রসিদ্ধ। (আল-মুস্তাদরাক, হাকিম)
জমজমের পানি পান করার সময় কী নিয়ত করবেন?
হাদিসে এসেছে:
"ماء زمزم لما شرب له
অর্থ: জমজমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হয়, সেই উদ্দেশ্যের জন্যই তা উপকারী হয়। (ইবনে মাজাহ)
আপনি নিম্নলিখিত নিয়ত করতে পারেন—
- উপকারী জ্ঞান লাভের জন্য।
- সুস্থতার জন্য।
- হালাল ও প্রশস্ত রিজিকের জন্য।
- ঈমান দৃঢ় হওয়ার জন্য।
- গুনাহ ক্ষমার আশা নিয়ে।
- নেক আমলের তাওফিকের জন্য।
- সন্তানদের কল্যাণের জন্য।
- দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার জন্য।
জমজমের পানির ফজিলত
১. বরকতময় পানি
রাসুল ﷺ জমজমের পানিকে বরকতময় বলেছেন।
২. খাদ্যের বিকল্প হিসেবে উল্লেখ
সহিহ মুসলিমে আবু যার (রা.)-এর বর্ণনায় এসেছে, জমজমের পানি খাদ্যস্বরূপ উপকারী হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আরবী হাদিসের মূল পাঠ (متن) নিচে দেওয়া হলো:
عَنْ أَبِي ذَرٍّ رضي الله عنه، قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَنْ زَمْزَمَ: «إِنَّهَا مُبَارَكَةٌ، إِنَّهَا طَعَامُ طُعْمٍ
(সহিহ মুসলিম)
উচ্চারণ: "ইন্নাহা মুবারাকাতুন, ইন্নাহা তা‘আমু তু‘মিন।"
অর্থ: "নিশ্চয় এটি বরকতময়, আর এটি এমন খাদ্য যা মানুষের ক্ষুধা নিবারণ করে বা তৃপ্তি দেয়।"
৩. কল্যাণের উদ্দেশ্যে পান করা হয়
ইসলামী শিক্ষায় জমজমের পানি আল্লাহর রহমতের নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।
রাসুলুল্লাহ ﷺ জমজমের পানির বরকত ও গুরুত্ব সম্পর্কে একাধিক হাদিসে বর্ণনা করেছেন। যারা <a href="/umrah-packages">উমরাহ প্যাকেজ</a>-এর মাধ্যমে পবিত্র মক্কায় যান, তারা জমজমের পানি পান করার পাশাপাশি মসজিদুল হারামে ইবাদতের বিশেষ সুযোগও লাভ করেন।
জমজমের পানি কি রোগ নিরাময় করে?
হাদিসে জমজমের পানির শিফার কথা উল্লেখ রয়েছে।
ইবন আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
إِنَّهَا مُبَارَكَةٌ، طَعَامُ طُعْمٍٍٍ وَشِفَاءُ سُقْمٍٍ ‘
নিশ্চয় তা সুখাদ্য খাবার এবং রোগের শিফা।’
তবে ইসলামী দৃষ্টিতে এটি আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। জমজমের পানি চিকিৎসকের চিকিৎসার বিকল্প নয়। অসুস্থ হলে চিকিৎসা গ্রহণের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে শিফা প্রার্থনা করা উচিত।
জমজমের পানি সংরক্ষণের নিয়ম
জমজমের পানি পরিষ্কার ও নিরাপদ পাত্রে সংরক্ষণ করুন। অপচয় করবেন না এবং সর্বদা সম্মানের সঙ্গে ব্যবহার করুন। যারা প্রথমবার হজ বা উমরাহ পালন করবেন, তারা গাইডেন্স ও সাপোর্ট সেবা গ্রহণ করলে জমজমের পানি সংগ্রহ, বহন ও সংরক্ষণ সম্পর্কে সঠিক দিকনির্দেশনা পেতে পারেন।
- পরিষ্কার বোতলে রাখুন।
- ঢাকনা ভালোভাবে বন্ধ রাখুন।
- অপবিত্র স্থানে রাখবেন না।
- অপ্রয়োজনীয় অপচয় করবেন না।
- অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে পান করানো উত্তম।
জমজমের পানি উপহার দেওয়া।
إهداء ماء زمزم (ইহদাউ মা-ই জমজম:
হাদিস ও ফিকহের গ্রন্থগুলোতে একে একটি বরকতময় উপহার বা হাদিয়া হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সৌদি আরব ভ্রমণের আগে যা জানা জরুরি
জমজমের পানি পান করার সৌভাগ্য অর্জনের জন্য হজ বা উমরাহ সফরের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা উচিত। বিশেষ করে ভিসা প্রসেসিং সঠিকভাবে সম্পন্ন করলে ভ্রমণ পরিকল্পনা নির্বিঘ্ন হয় এবং সময়মতো সফর সম্পন্ন করা সহজ হয়।
হজ ও উমরাহ সফরের পরিকল্পনা
জমজমের পানি পান করা হজ ও উমরাহ সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা। তাই সফরের আগে উপযুক্ত হজ্জ প্যাকেজ, উমরাহ প্যাকেজ , এয়ার টিকিটিং, ভিসা প্রসেসিং এবং গাইডেন্স ও সাপোর্ট সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে পরিকল্পনা করলে পুরো যাত্রা আরও সহজ, নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হয়।
জমজমের পানি সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা
প্রচলিত ধারণা
- নির্দিষ্ট পরিমাণ পান করতে হবে
- শুধু হাজিরাই পান করতে পারবেন
- সাধারণ পানির সঙ্গে মেশানো যাবে না
- শুধু মক্কায় পান করা যাবে
সঠিক তথ্য
- সহিহ হাদিসে এমন বাধ্যবাধকতা নেই।
- যে কোনো মুসলিম পান করতে পারেন।
- এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞার সহিহ দলিল নেই।
- বাইরে নিয়ে গিয়েও পান করা বৈধ।
করণীয় ও বর্জনীয়
করণীয়
- বিসমিল্লাহ বলা
- দোয়া করা
- আল্লাহর ওপর ভরসা করা
- পরিষ্কার পাত্র ব্যবহার করা
বর্জনীয়
- অপচয় করা
- কুসংস্কারে বিশ্বাস করা
- চিকিৎসা বাদ দেওয়া
- অসম্মান করা
জমজমের পানি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাদিস
ইবনে মাজাহ
ماء زمزم لما شرب له
অর্থ: জমজমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হয়, সেই উদ্দেশ্যের জন্য তা উপকারী হয়।
সহিহ মুসলিম
আবু যার (রা.)-এর হাদিসে জমজমের পানিকে খাদ্যস্বরূপ বরকতময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।